মার্চের শেষ ভাগে বাংলাদেশের আকাশ যেন এক জীবন্ত মহাজাগতিক প্রদর্শনীতে রূপ নিচ্ছে। দিনের গরম কিছুটা কমে এসে যখন সন্ধ্যার আকাশ পরিষ্কার ও নির্মল হয়ে ওঠে, তখনই চোখে পড়ে চমকপ্রদ সব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দৃশ্য।

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেখা যাবে গ্রহের মেলা, চাঁদের লুকোচুরি আর নক্ষত্রপুঞ্জের উজ্জ্বল উপস্থিতি; সব মিলিয়ে এক মহাজাগতিক থিয়েটার।

গ্রহের রাজকীয় শোভাযাত্রা

ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সেই আলোচিত প্ল্যানেট প্যারেড মার্চের শেষ দিকেও আকাশপ্রেমীদের মুগ্ধ করে যাবে। তবে এবার গ্রহগুলোর অবস্থানে আসবে নতুন এক বিন্যাস, যা দৃশ্যটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।

১৬ মার্চের পর সূর্যাস্তের পরপরই পশ্চিম আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে দেখা দেবে শুক্র গ্রহ। যাকে আমরা সাধারণত সন্ধ্যাতারা নামে চিনি, এই সময়ে তার দীপ্তি থাকবে আরও চোখে পড়ার মতো। এর খুব কাছাকাছি অবস্থান করবে বুধ গ্রহ। সাধারণত সূর্যের খুব নিকটে থাকায় বুধকে দেখা কঠিন হলেও, মার্চের এই সময়ে এটি তুলনামূলক দূরে সরে আসায় গোধূলির আকাশে সহজেই নজরে আসবে।

অন্যদিকে সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতি মাঝ আকাশে তার দাপট বজায় রাখবে। টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে এর চারটি প্রধান উপগ্রহ গ্যালিলিয়ান চাঁদগুলোও পরিষ্কারভাবে দেখা যাবে। আর শনি, তার মনোমুগ্ধকর বলয়সহ, ভোরের আকাশে সূর্য ওঠার আগে পূর্ব দিগন্তে উদিত হবে। বিশেষ করে মার্চের শেষ সপ্তাহে এই গ্রহটিকে দেখার সুযোগ থাকবে সবচেয়ে ভালোভাবে।

মহাজাগতিক মিলন

২০ থেকে ২৫ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশের আকাশে ধরা দেবে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যগুলোর একটি। এই সময়টায় চাঁদের সরু ফালি একে একে বিভিন্ন গ্রহের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে, সৃষ্টি করবে এক অপূর্ব আকাশীয় সমন্বয়।২০ থেকে ২২ মার্চের মধ্যে নবচাঁদ বা ক্রিসেন্ট মুন ধীরে ধীরে শুক্র ও বুধ গ্রহের খুব কাছে চলে আসবে। সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে তাকালে মনে হবে, নীল আকাশের ক্যানভাসে চাঁদ আর শুক্র যেন এক নীরব আলিঙ্গনে আবদ্ধ।

এরপর ২৫ মার্চ চাঁদ পৌঁছে যাবে বৃহস্পতি গ্রহের কাছাকাছি। উজ্জ্বল বৃহস্পতি আর রুপালি চাঁদের এই যুগল দৃশ্য খালি চোখেই উপভোগ করা যাবে। ঢাকা ও আশপাশের অপেক্ষাকৃত আলোকদূষণমুক্ত এলাকাগুলো থেকে এই দৃশ্য হবে আরও পরিষ্কার ও দৃষ্টিনন্দন।

বসন্তকালীন বিষুব

২০২৬ সালের ২০ মার্চ পালিত হবে বসন্তকালীন বিষুব, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এদিন সূর্য ঠিক পূর্ব দিক থেকে উদিত হয়ে পশ্চিমে অস্ত যায়, ফলে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য প্রায় সমান থাকে। বিষুবরেখার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে এই পরিবর্তনটি বিশেষভাবে স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। এটি বসন্ত ঋতুর পূর্ণতা এবং ঋতু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবেও বিবেচিত।

নক্ষত্রপুঞ্জ ও ছায়াপথের রূপ

মার্চের শেষ দিকে রাত ১০টার পর আকাশের মাঝামাঝি অংশে চোখ রাখলেই দেখা যাবে কালপুরুষ নক্ষত্রপুঞ্জ। এর তিনটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের সারি যা ‘বেল্ট’ নামে পরিচিত সহজেই চেনা যায়। কালপুরুষের ঠিক নিচে, দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে জ্বলজ্বল করবে লুব্ধক বা সাইরাস, যা আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র।

এর পাশাপাশি উত্তর আকাশে দেখা মিলবে সপ্তর্ষিমণ্ডল বা আরসা মেজর-এর। ঢাকার মতো আলোকদূষণপূর্ণ শহরেও এই নক্ষত্রপুঞ্জ সহজেই শনাক্ত করা যায়। তবে শহরের বাইরে খোলা ও অন্ধকার জায়গায় গেলে রাতের গভীরে মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গার হালকা সাদা ঝাপসা আভাও চোখে পড়তে পারে, যা আকাশপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে।

যেসব বিষয় খেয়াল রাখতে হবে

৩১ মার্চ পর্যন্ত গোধূলিবেলা অর্থাৎ সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে গ্রহ পর্যবেক্ষণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই সময়ে আকাশ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকে এবং পশ্চিম দিগন্তে গ্রহগুলো সহজে চোখে পড়ে। তাই বাড়ির ছাদ বা কোনো খোলা মাঠ বেছে নিলে ভালো, যেন পশ্চিম আকাশ বাধাহীনভাবে দেখা যায়।

খালি চোখেই শুক্র, বৃহস্পতি ও মঙ্গল গ্রহ দেখা সম্ভব। তবে শনির বলয় বা ইউরেনাসের হালকা নীলচে আভা স্পষ্টভাবে দেখতে চাইলে অন্তত ১০×৫০ ক্ষমতার একটি বাইনোকুলার ব্যবহার করা প্রয়োজন। এতে করে গ্রহগুলোর সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য আরও ভালোভাবে উপভোগ করা যাবে।

সূত্র: দ্য স্কাই লাইভ, স্কাইম্যাপ অনলাইন