কৃষি সচিবের বাধ্যতামূলক অবসর: ব্রিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগকাণ্ড উন্মোচনের সুযোগ

গত ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে “বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী” উদযাপন কমিটির সদস্য-সচিব এবং আলোচিত কৃষি সচিব ড. এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সার ক্রয় সংক্রান্ত বিতর্কিত কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি কৌশলে কৃষি সচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করে পূর্ববর্তী সময়ের দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে সুরক্ষা দিয়েছেন এবং তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
বিশেষত, স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব ন্যস্ত থাকায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম কার্যত সচিবের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই সুযোগে অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে এবং একটি শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী চক্র গড়ে ওঠে। তার অপসারণের ফলে এই চক্র ভাঙার এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম উন্মোচনের একটি বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এ তড়িঘড়ি করে প্রায় ৭৫টি শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এসব নিয়োগে একের পর এক জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ পেতে থাকে। ইতোমধ্যে দুইজন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি সদর দপ্তরে যোগদান করতে এসে ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। আরও কয়েকজন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি যোগদানই করেননি। এতে ব্রি এবং সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হলে ব্রি কর্তৃপক্ষ দ্রুত “ইন্ডাকশন ট্রেনিং” নামে একটি সীমিত পরিসরের কার্যক্রম পরিচালনা করে। সেখানে মাত্র ১৮টি পদের বিপরীতে ৩২ জন কর্মকর্তাকে ডাকা হলেও ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের আরও ৪৩ জনের বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ব্রি সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে পরিচালক (গবেষণা), উপ-পরিচালক (প্রশাসন) এবং একাধিক সহকারী পরিচালক পর্যন্ত একটি চক্র এই নিয়োগ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত।

অভিযোগ রয়েছে, এদের অনেকেই পূর্ববর্তী সময়েও একই ধরনের অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এমনকি যেই বোর্ড সভায় এসব নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়, সেখানে বিতর্কিত পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারাও যুক্ত ছিলেন।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তি বিশেষকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে পদোন্নতি প্রদান, নিয়োগ বাণিজ্য, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তহবিল গঠন এবং তা বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করা হয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালনা, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং স্বজনপ্রীতির ঘটনাও সামনে এসেছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, একই ব্যক্তি বা চক্রের মাধ্যমে একাধিক প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, ভুয়া বিল উত্তোলন, একাধিক উৎস থেকে একই ব্যয়ের অর্থ গ্রহণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সহকর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে একটি “প্যারালাল ক্ষমতা কাঠামো” তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত প্রায় দেড় বছরে ব্রি’র মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তৎকালীন কৃষি সচিবের প্রভাবের কারণে কোনো কার্যকর তদন্ত হয়নি বলে জানা যায়। বিশেষ করে পার্টনার প্রকল্পের (ব্রি অংগ) বিপুল অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার অভাব এই অনিয়মকে আরও উৎসাহিত করেছে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি—
ব্রি’র বর্তমান পরিস্থিতি তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের স্বাধীন কমিটি গঠন,
বিতর্কিত নিয়োগসমূহ বাতিল,
অতীত ও বর্তমানের সব অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত,
এবং ভবিষ্যতে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।

এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সরকারের ঘোষিত “দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স” নীতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।