পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির সকল বন্দর সোমবার (১৩ এপ্রিল) থেকে অবরোধ করার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

রোববার (১২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ১৩ এপ্রিল স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে আসা-যাওয়া করা সকল সামুদ্রিক যানের ওপর এই অবরোধ কার্যকর হবে।

সেন্টকম আরও জানিয়েছে, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলসহ ইরানের বিভিন্ন বন্দরে যাতায়াতকারী ‘সকল দেশের জাহাজ’ এই অবরোধের আওতায় থাকবে।

সেন্টকম জানিয়েছে, ‘ইরানি বন্দর বাদে অন্য দেশের বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের স্বাধীনতায় মার্কিন বাহিনী কোনো বাধা দেবে না।’

এটি মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের হুমকির তুলনায় কিছুটা নমনীয় অবস্থান। ট্রাম্প আগে পুরো হরমুজ প্রণালি অবরোধ করার এবং ইরানকে টোল দেওয়া জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মার্কিন পক্ষের এই বক্তব্যে ‘অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে’ এবং তথ্যের মধ্যে এক ধরণের ‘অসংগতি’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প বলেছিলেন হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবেশ করা বা বের হওয়া সকল জাহাজই এই অবরোধের লক্ষ্যবস্তু হবে। কিন্তু সেন্টকম এখন বলছে, এটি কেবল ইরানি বন্দরগুলোতে আসা-যাওয়া করা জাহাজগুলোর ওপর কার্যকর হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের হুমকির পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়েছে। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০৪ দশমিক ২৪ ডলারে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের [অপরিশোধিত তেল] দাম ৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১০২ দশমিক ২৯ ডলার।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে তেহরান বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর ফলে এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে।

ইরান এই প্রণালি দিয়ে নিজেদের জাহাজ চলাচল অব্যাহত রেখেছে এবং অন্য দেশের জাহাজগুলোকে সীমিত আকারে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। ইরানি কর্মকর্তারা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর টোল চালুর বিষয়েও আলোচনা করেছেন।

ট্রাম্পের এই অবরোধের হুমকির জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কোনো দেশের যুদ্ধজাহাজ যদি এই অঞ্চলের দিকে আসে তবে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।

উল্লেখ্য, এই যুদ্ধবিরতি আগামী ২২ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরই মূলত যুক্তরাষ্ট্র এই অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে, যা নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।

চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য ইরানি কর্মকর্তারা মার্কিন পক্ষকে দায়ী করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর যখন ‘মাত্র সামান্য দূরে’ ছিল, ঠিক তখনই মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা ‘শর্ত বদলে দিয়ে’ শান্তি প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছেন।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক জোহরা খারাজমি বলেন, ইরানিরা কেমন আচরণ করবে বা কোন জাহাজগুলো চলাচল করতে পারবে, তা ‘নির্দেশ দেওয়ার মতো অবস্থানে’ যুক্তরাষ্ট্র নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘এই অবরোধ যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সহনশীলতা এবং বিশ্ববাজারের সহনশীলতার মধ্যে একটি প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তবে কে হারছে তা দেখতে খুব বেশি সময় লাগবে না।’ তিনি যোগ করেন, ইরান একটি ‘দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত’।

জোহরা খারাজমি সতর্ক করে বলেন, ‘প্রযুক্তিগতভাবে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। হলিউড-স্টাইলের কৌশল দিয়ে তারা এই যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ী হতে পারবে না।’