ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারকে ‘লুজার’ বা ‘অভাগা’ বলে কটাক্ষ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমন দাবিই করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। ইরান যুদ্ধ ও ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি ইস্যুতে দুই দেশের সাম্প্রতিক মতবিরোধের মধ্যেই ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসায় হোয়াইট হাউস ও ডাউনিং স্ট্রিটের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

প্রভাবশালী এই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, গত দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি ব্যক্তিগত নৈশভোজে মার্কিন রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে নিয়ে এ মন্তব্য করেন। এটিই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তার সবচেয়ে কটূক্তিপূর্ণ মন্তব্য বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

একটি সূত্র দ্য টেলিগ্রাফকে জানায়, ‘ট্রাম্প এখন স্টারমারকে ‘লুজার’ বলে ডাকছেন। বন্ধুদের সঙ্গে এক নৈশভোজে তিনি এ কথা বলেছেন। তার মানে হচ্ছে, স্টারমারের আর ভবিষ্যৎ নেই।’ এর আগে ট্রাম্প স্টারমারকে ‘উইনার’ বা বিজয়ী বলে উল্লেখ করেছিলেন। সেই অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন এই ভাষা ব্যবহার করায় ধারণা করা হচ্ছে, হোয়াইট হাউস ও ডাউনিং স্ট্রিটের সম্পর্ক সম্ভবত স্থায়ীভাবে শীতল হয়ে গেছে।

এদিকে মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের বিষয়ে পর্যাপ্ত সমর্থন না দেয়ায় স্টারমারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, স্টারমার ‘উইনস্টন চার্চিল নন’ এবং তিনি ‘সম্পর্ক নষ্ট করেন’।

হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর অভিবাসন ও জ্বালানি নীতিকেও ‘ভয়াবহ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি যুক্তরাজ্যকে ‘শরিয়া আদালত’ তুলে দেয়া এবং উত্তর সাগরে তেল-গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর আহ্বান জানান। এর আগে সপ্তাহের শুরুতে দ্য টেলিগ্রাফকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, চাগোস দ্বীপপুঞ্জের ডিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটি সামরিক হামলার জন্য ব্যবহার করতে প্রাথমিকভাবে বাধা দেয়ায় তিনি স্টারমারের ওপর ‘খুব হতাশ’।

আন্তর্জাতিক আইন দেখিয়ে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রকে আরএএফ ঘাঁটি থেকে হামলার অনুমতি দেয়নি। তবে রোববার রাতে স্টারমার অবস্থান পরিবর্তন করে বলেন, ‘নির্দিষ্ট ও সীমিত প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে’ যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হবে।

এই বিরোধের জেরে ট্রাম্প ব্রিটেনের বিতর্কিত চাগোস চুক্তিতে সমর্থন প্রত্যাহার করেন। ওই চুক্তির আওতায় যুক্তরাজ্য ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান ওশান টেরিটরির মালিকানা মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করবে, বিনিময়ে ডিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটির ইজারা নেবে।

এদিকে স্টারমারকে ‘লুজার’ বা ‘অভাগা’ হিসেবে উল্লেখ করা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান বদলে গেছে। অবশ্য ট্রাম্প তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, বিশেষ করে শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাটদের প্রায়ই ‘লুজার’ বলে উল্লেখ করেন। বিপরীতে নিজে ও রিপাবলিকান ঘনিষ্ঠদের ‘উইনার’ বলে অভিহিত করেন।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার দুই মাস আগে ট্রাম্প টাওয়ারে এক নৈশভোজে সাক্ষাতের সময় তিনি স্টারমারকে ‘উইনার’ বলে প্রশংসা করেছিলেন বলে জানা যায়।

২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর নিউইয়র্কে সাক্ষাতের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় তিনি খুব ভালো মানুষ। তিনি চমৎকার প্রচার চালিয়েছেন, ভালো করেছেন। সময় খুব বেশি হয়নি, তিনি খুব জনপ্রিয়।’

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরও ট্রাম্প ও স্টামারের সম্পর্ক সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। দায়িত্ব নেয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প বলেন, স্টারমার ‘এ পর্যন্ত খুব ভালো কাজ’ করেছেন এবং তাদের ‘খুব ভালো সম্পর্ক’ রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে প্রথম বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, তাদের সম্পর্ক ‘দারুণভাবে শুরু হয়েছে’ এবং স্টারমারের ‘সুন্দর উচ্চারণের’ প্রশংসা করেন।

যুক্তরাষ্ট্র শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়ার পর ট্রাম্প স্টারমারকে ‘খুব কঠোর আলোচক’ বলে বর্ণনা করেন এবং বলেন, ‘ওখানে তাকে যা দেয়া হয়, তা তিনি অর্জন করেছেন।’

এমনকি জুলাই মাসেও স্কটল্যান্ড সফরে ট্রাম্প স্টারমারের ‘চমৎকার স্ত্রী ও পরিবার’-এর প্রশংসা করে বলেন, ‘আমি আপনার প্রধানমন্ত্রীকে পছন্দ করি। তিনি আমার চেয়ে কিছুটা বেশি উদারপন্থি, তবে আমি তাকে পছন্দ করি।’

তবে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর চুক্তির পর সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে। সোমবার প্রকাশিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ডিয়েগো গার্সিয়া ব্যবহারে বাধা দেয়ার সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কে আগে কখনও ঘটেনি এমন ঘটনা।

তিনি বলেন, স্টারমার মত পরিবর্তনে ‘অনেক দেরি’ করেছেন এবং ‘মনে হচ্ছে তিনি আইনি বৈধতা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন’। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা কিয়ারের ওপর খুব হতাশ ছিলাম,’ এবং চাগোস চুক্তিকে ‘খুব অদ্ভূত ধরনের বিষয়’ বলেও উল্লেখ করেন।

মঙ্গলবার তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে স্টারমারকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘এটা সেই উইনস্টন চার্চিল নন, যার সঙ্গে আমরা কাজ করছি।’

ডিয়েগো গার্সিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দ্বীপটির ইজারা নিয়ে সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে কোথায় অবতরণ করবে তা ঠিক করতে ‘তিন বা চার দিন’ লেগেছে এবং এতে অতিরিক্ত কয়েক ঘণ্টা উড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ওখানে নামতে পারলে অনেক বেশি সুবিধাজনক হতো। তাই আমরা খুবই বিস্মিত।’