পারস্যের নীল জলে একা যেতে ভয় যুক্তরাষ্ট্রের

অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে এবং নিজেদের যুদ্ধজাহাজ গুলোকে ইরানি হাইপারসনিক মিসাইলের হাত থেকে বাঁচাতে এবার মিত্রদের দ্বারে দ্বারে ধরনা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স থেকে শুরু করে এশিয়ার বৃহৎ তেল-ক্রেতা জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এমনকি চীনের কাছেও হাত পেতেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ পাহারায় যুদ্ধজাহাজ চেয়ে আকুতি জানিয়েছেন। কিন্তু তেহরানের বিধ্বংসী হামলার ভয়ে কোনো পরাশক্তিই ওয়াশিংটনের এই ‘ডুবন্ত নৌ-জোটে’ যোগ দিতে রাজি হয়নি। ফলে পারস্য উপসাগরের নীল জলে একা ‘সফর’ করতে ভয় পাচ্ছে পেন্টাগন।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। এতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাজ্যের এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ একান্তই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের, ন্যাটোর নয়। ইউরোপের আরেক পরাশক্তি জার্মানিও যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ মিশনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম মিত্র অস্ট্রেলিয়াও ট্রাম্পের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে। হরমুজে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর মার্কিন চাপের বিরুদ্ধে সিউলের রাস্তায় নেমে এসেছেন হাজার হাজার মানুষ। তীব্র বিক্ষোভের মুখে দক্ষিণ কোরীয় সরকারও মার্কিন নৌজোটে যোগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। এতে চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ ট্রাম্প বলেছেন, বিপদে আমরা তাদের পাশে থাকি, অথচ আমাদের প্রয়োজনের সময় মিত্ররা সঙ্গ দিচ্ছে না।
এদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছে, ট্রাম্পের সাহস থাকলে তিনি তার জাহাজ উপসাগরে পাঠাক। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এই জলপথের সুরক্ষায় সামরিক শক্তি প্রয়োগের বদলে কূটনীতির পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে তারা সরাসরি ইরানের সঙ্গেই আলোচনা করবেন। খবর তাসনিম নিউজ, রয়টার্স, বিবিসি, এএফপি ও আলজাজিরাসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের।
হরমুজ নিয়ে ইরানের চ্যালেঞ্জ : আইআরজিসি মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নাইনি যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি আইআরজিসির নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ট্রাম্প তো বলেছিলেন, তিনি ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস করেছেন? তাহলে সাহস থাকলে তিনি তার জাহাজ পারস্য উপসাগরে পাঠাতে পারেন। নাইনি দাবি করেন, ইরান এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় ৭০০ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩ হাজার ৬০০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘শত্রু’ যখন ইরানের সামরিক শক্তি ও সামাজিক প্রতিরোধক্ষমতা স্বীকার করবে, তখনই যুদ্ধ শেষ হবে।
ন্যাটোসহ বিভিন্ন দেশের দ্বারে দ্বারে ট্রাম্প : শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনসহ মিত্রদেশ ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে সহায়তার আহ্বান জানান। তবে কোনো দেশই তার আহ্বানে সাড়া দেয়নি। সোমবার হতাশ ট্রাম্প দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইউক্রেনকে সহায়তা করেছে, ঠিক একইভাবে ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করা। বিপদের সময় যদি মিত্রদের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়া যায়, তবে আমি মনে করি ন্যাটোর ভবিষ্যতের জন্য এটি খুব খারাপ হবে। এটি আমরা মনে রাখব। ট্রাম্প জানান, হরমুজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি ইতোমধ্যে সাতটি দেশের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
যুক্তরাজ্যের শ্রম ও অবসরবিষয়ক মন্ত্রী প্যাট ম্যাকফ্যাডেন বলেছেন, বর্তমান সংঘাতকে ন্যাটো জোটের সামরিক অভিযানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না। ইরানযুদ্ধ ন্যাটোর নয়; এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ পদক্ষেপ। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প খুবই লেনদেননির্ভর। তার সব কথা শুনতে বাধ্য নয় যুক্তরাজ্য।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে পাহারা দেওয়ার জন্য জাহাজ পাঠানোর বিষয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। সংবিধানের যুদ্ধবিরোধী বাধ্যবাধকতার কারণে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা জাপানের নেই।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজের মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাথরিন কিং এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমরা জানি, এটি (হরমুজ) উন্মুক্ত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের কাছে এমন কোনো অনুরোধ করা হয়নি এবং আমরা এতে অংশ নিচ্ছি না।
জার্মান সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইরান যুদ্ধের সঙ্গে ন্যাটোর কোনো সম্পর্ক নেই। জার্মানি যুদ্ধ বা সামরিক উপায়ে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার কোনো চেষ্টায় যোগ দেবে না। গ্রিসও এমন কোনো সামরিক তৎপরতায় জড়াবে না বলে জানিয়েছেন গ্রিস সরকারের মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস।
৩৩৬৯ ইসরাইলি আহত : যুদ্ধ শুরুর পর ইরানি হামলায় তিন হাজার ৩৬৯ ইসরাইলি আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় আহত হয়েছেন ১৪২ জন। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য দিয়েছে।
তেহরানে ইসরাইলি বিমান হামলা : তেহরানের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বিদ্যুৎ বিভাগের একটি ভবনে ইসরাইলি বিমান হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন।
সৌদি আরবে দেড় ঘণ্টায় ৩৭ ড্রোন : সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে দেড় ঘণ্টায় ৩৭টি ড্রোন ধেয়ে গেছে। এসব ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
