আমার মতে, জামায়াতে ইসলামী তার অতীত ও ভবিষ্যতের বেস্ট নির্বাচনী ফলাফল করে ফেলেছে ২০২৬-এ। বিএনপি দল ও সরকার হিসেবে যদি আগামী ৫ বছর খুব ভয়াবহ টাইপের খারাপ পারফরমেন্স (বিশেষ করে দুর্নীতি, আইশঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দ্রব্যমূল্য ও ভারত ইস্যুতে) না করে থাকে, এবং এই সময়ে এনসিপি যদি সঠিক কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে জামায়াত পরবর্তী নির্বাচনে ২০২৬ এর চেয়ে খারাপ ফলাফল করবে। গত নির্বাচন ছিল জামায়াতের পিক। যত সময় যাবে, দলটির নানান দুর্বলতা এক্সপোজ হতে থাকবে। অলরেডি কিছু ক্ষেত্রে সেটা দেখা যাচ্ছে (উদাহরণ না দিলাম)।
কেন খারাপ করবে? অনেক কারণ আছে। এর মধ্যে কয়েকটা হল:–রাজনীতিতে জামায়াতের সবচেয়ে বড় কারেন্সি- ‘সৎ লোকের শাসন’। বিএনপি আওয়ামী লীগের তুলনায় নিজেদের তুলনামূলক ‘দুর্নীতিমুক্ত’ বা ‘সৎ’ বলে মনে করেন দলটির নেতাকর্মীরা।
 কিছু ক্ষেত্রে হয়তো এটার বাস্তবতা আছে। মূলত ধর্মীয়/পরকাল ভিত্তিক সফলতায় ফোকাস থাকার কারণে ধর্মীয় দলগুলোতে টাকা পয়সা সংক্রান্ত দুর্নীতি তুলনামূলক কম হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু জামায়াতের একদম সবাই যে দুর্নীতিমুক্ত ফেরেশতা তা অবশ্যই নয়। স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিলে অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই হয়তো অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া যাবে। দুর্নীতি কম হওয়ার আরেক কারণ ক্ষমতায় বা ক্ষমতার একদম কাছাকাছি না থাকা।
আমরা ধারণা, যেহেতু এখন সংসদে বিরোধী দল হয়ে ক্ষমতার কিছুটা কাছাকাছি হয়েছে দলটি, এখন সংশ্লিষ্ট অনেকেরই আর্থিক অসততার খবর বের হবে। এক্ষেত্রে দলটির প্রতি হোস্টাইল মিডিয়াও ভূমিকা রাখবে। ছোট ঘটনাকে বড় করে দেখাবে। আর বড় ঘটনা ঘটলে তো কেল্লাফতে!
তবে জামায়াত সংশ্লিষ্ট অনেকের অসততার বড় জায়গাটি হবে, নন-আর্থিক জায়গায়। আদর্শিক (ধর্মীয় বা বামপন্থী রাজনীতির) দলগুলো ‘গ্রেটার গুড’ এর লজিক দিয়ে অনেক অনিয়মকে দুর্নীতিকে হালাল করে ফেলে। যেমন, নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতিমূলকভাবে দল/গোষ্ঠিপ্রীতি, ভিন্ন চিন্তার লোক হলে অন্যায্যভাবে তার প্রাপ্য কোন কিছু থেকে বঞ্চিত করা, অন্যের কাজের ক্রেডিট নিজে নিয়ে নেয়া, মিথ্যা বলা– এরকম আরো অনেক কিছু আছে।

আবার জামায়াতের যেহেতু তার কোর দলীয় মানুষদের মধ্যে আধুনিক রাষ্ট্র-রাজনীতির জন্য যথাযথ যোগ্য লোকের অভাব, ফলে অনেক লোকজনকে ভাড়া করবে। এতে অনেক চোর-বাটপারকে বুঝে না বুঝে জায়গা দেবে। পরে এদের বাটপারির দায় নিতে হবে। এটার রিসেন্ট উদাহরণ জামায়াত আমিরের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা কেন্দ্রিক ঘটনাবলীর।
–যোগ্যতার উপর আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়া। এটাও আদর্শ ভিত্তিক এবং ক্যাডার ভিত্তিক দলের একটা নেতিবাচক দিক। জামায়াত দল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে আনুগত্যের উপর। ফলে ব্যতিক্রম ছাড়া যোগ্য লোকজন সেখানে জায়গা পান না বা পেতে চান না। মাঠের আন্দোলনের রাজনীতিতে অবশ্য এই বিষয়টা প্লাস পয়েন্ট হিসেবে থাকে। 
এ কারণে বিগত দশকগুলোতে ছোট দল হয়েও রাজনীতির মাঠে শক্তি দেখাতে সক্ষম ছিল জামায়াত। কিন্তু এখন রাষ্ট্র পরিচালনার কাছাকাছি এসে দরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র চালানোর জন্য দরকারি সেক্টরগুলোতে পারফর্ম করার, পরিচালনা করার মতো যোগ্য ও অভিজ্ঞ লোক, যা জামায়াতের হাতে এনাফ নাই। এটা খুব বাড়বেও না। আদর্শিক এবং ঐতিহাসিক কারণে, মার্কেটে যেসব যোগ্য লোক অলরেডি আছেন তাদের কাউকে কাউকে দলটি নিতে চাইলেও তারা যাবেন না।
 আবার কেউ কেউ দলটির সাথে কাজ করতে ইচ্ছুক হলেও নানান নিজেদের লিমিটেশনের কারণে জামায়াত নিতে পারবে না। রিসেন্টলি কিছু ক্ষেত্রে দলটি শিতিলতা দেখালেও এটা খুব বেশি দূর আগাবে না। আগালে দলের মধ্য থেকেই প্রতিরোধ আসবে।
–গোষ্ঠিতান্ত্রিকতা ও তা থেকে উৎসারিত দখলদারি মানসিকতা। এটা আরেকটা বড় কারণ জামায়াতের ভবিষ্যতে ভাল করতে না পারার। যারা জামায়াতের দলীয় লোকজন নিজস্ব বলয় ও গোষ্ঠির বাইরে চিন্তা করতে পারেন এমন খুব কমই দেখেছি। নিজেদের লোকজনের বাইরে ধর্মীয়, ব্যবসায়িক, সামাজিক, রাজনৈতিক কোন পরিসরেই তারা কমফর্ট ফিল করেন না। ফলে তারা সমাজের মূলধারা হয়ে উঠতে পারবে না।

একটা গোষ্ঠি আকারে থাকবে। গোষ্ঠি আকারে থাকাটাই তার শক্তি। এটি ভেঙ্গে গেলে বরং তার দুর্বলতা উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এটা আগামী দুই তিন দশকের মধ্যেও চাইলেও জামায়াত চেঞ্জ করতে পারবে না। এই গোষ্ঠিতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নিজেদের বলয়ের বাইরে ভাল/সম্ভাবনাময় কিছু দেখলে সেটিকে দখল করার একটা মানসিকতা কাজ করে দলটির লোকজনের মধ্যে। ‘আমাদের’ এবং ’আমাদের না’ এই দুই বর্গে সমাজ ও দুনিয়ার সবকিছু দেখেন তারা।–ধর্মকে কেন্দ্র করে গোঁড়ামি। এই কথাটা বলাটা একটু ঝুঁকিপূর্ণ তাও বললাম। জামায়াতের একটা অংশ বা উপরের দিকে একটা অংশ বিগত দেড় বছর তুলনামূলক উদারপন্থার চর্চা করার চেষ্টা করলেও জামায়াতের মূল জনশক্তি মূলত নিজস্ব পরিবার, শিক্ষা এবং দলীয় পরিসর থেকে যে ধর্মীয় ধারণা লাভ করেন থাকেন সেটিকে অত্যন্ত গোঁড়াভাবেই আকড়ে থাকতে ভালোবাসেন। নিজেদের বুঝের বাইরে ধর্মের আরও যে নানান বুঝ থাকতে পারে সেটা তারা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এটা অবশ্য দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের মুসলমানদের অবস্থা। ধর্ম বিষয়ে নিজের অলরেডি পাওয়া বুঝের বাইরে অন্যসব বুঝ ভুল ও বাতিল- এটা প্রায় সবাই ধারণ করেন। এটিও জামায়াতে মূলধারার রাজনীতিতে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হতে বাধা তৈরি করবে।
–সামাজিক মাধ্যমের আচরণ। উপরের শেষের দুটি প্রবণতার কারণে সামাজিক মাধ্যমে জামায়াত/শিবিরের দলীয় লোকজন গোষ্ঠিবদ্ধভাবে অযৌক্তিক আচরণ করতে থাকেন এবং এই আচরণ প্রশ্নের মুখে পড়লে সেটাকে জায়েজ করতে আরও বেশি গোষ্ঠিবদ্ধভাবে আরও অযৌক্তিক এবং আপত্তিকর, এমনকি অপরাধমুলক আচরণ করতে পারেন তারা। এটিও দলটির নিকট ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্যের পথে বাধা হবে। এবং এটি চাইলেই দলের উপর লেভেল থেকে বদলে ফেলা যাবে না। একটা একটা স্ট্রেংথ হিসেবেই দেখা হয়েছে প্রতিকুল পরিবেশে। কিন্তু বর্তমানে তাদের রাজনীতির মূলধারায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে এটা আসলে স্ট্রেংথ না, উইকেনস।আরও অনেক কারণ আছে। মোটাদাগে কয়েকটা বললাম।
সো, জামায়াতের এইসব অবশ্যম্ভাবী দুর্বলতা এবং ক্ষমতাসীন অবস্থায় বিএনপির আস্তে আস্তে তৈরি হতে থাকা নানান নেতিবাচকতা (এবং আগে থেকে থাকা দলটির কিছু আনএভয়ডেবল দুর্বলতা) এসব মাথায় রেখে যদি এনসিপি নিজেদের পরিকল্পনা সাজাতে পারে, তাহলে আগামী নির্বাচনে জামায়াতের দ্বিতীয় দল হয়ে থাকা টাফ হয়ে হবে!