
পরবর্তী মিশনের আলোচনা সফল হলে আগামী জুন নাগাদ ঋণের পরবর্তী কিস্তির অর্থ পেতে পারে বাংলাদেশ।
অন্তবর্র্তী সরকারের সময়ে নেওয়া দেশের আর্থিক খাতের সংস্কারের উদ্যোগের ধারাবাহিকতা কতটুকু থাকবে, কী পরিবর্তন আনা হবে তা নির্বাচিত নতুন সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে এ সংস্কার নিয়ে সরকারের ‘রোডম্যাপের’ বিষয়ে আলোচনা করেছেন আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন।
এ রোডম্যাপের বিষয়ে বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করবেন সংস্থাটির আরেক কর্মকর্তা বাংলাদেশ মিশনের আবাসিক প্রতিনিধি ম্যাকসিম কিরিশকো।
আগামী মাসে ইতিমধ্যে ছাড় হওয়া অর্থের ব্যবহার দেখতে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসবে। এতে ষষ্ঠ কিস্তি ও বাকি অর্থ ছাড়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। এ আলোচনা সফল হলে আগামী জুন নাগাদ ঋণের পরবর্তী অর্থ পেতে পারে বাংলাদেশ।
মিশন পর্যায়ের এ সফর আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে হতে পারে ধরে নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সফরসূচি চূড়ান্ত ও রোডম্যাপ নিয়ে বুধবার আলোচনা করবেন ম্যাকসিম কিরিশকো।
তার আগে ঢাকা সফরে আসা কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে সংস্কার নিয়ে নতুন সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে কথা বলে গেলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র ও পরিচালক শাহরিয়ার সিদ্দিকি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘একটা বৈঠক হয়েছে। সেখানে তারা রোডম্যাপের মত একটা প্রতিবেদন চেয়েছে। কোনটা কখন কীভাবে করা হবে তার একটা ধারণা লিখিত আকারে চেয়েছে।’’
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এ বৈঠকে অংশ নেন তিন ডেপুটি গভর্নর ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের একজন নাম প্রকাশ না করে বলেন, “ঋণ চুক্তির সময়ে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত আর্থিক সংস্কারের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। পরে তাতে আইএমএফ কাটছাঁট ও নতুন কিছু শর্ত যোগ করে। কিস্তিতে ঋণ ছাড়ের সময়ে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখে আইএমএফ। এখন সেই পরিকল্পনার ধারাবহিকতা থাকবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা নতুন করে একটি রোডম্যাপ চেয়েছে।’’
এর আগে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটের যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা মোকাবেলায় ‘অতিরিক্ত অর্থের যোগান’ পেতে আইএমফের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, কোন শর্তে কত টাকা পাওয়া যাবে, তার বিস্তারিত আলোচনা হবে আগামী এপ্রিলে আইএমফের বসন্তকালীন বৈঠকে।
করোনা ভাইরাস মহামারীর পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার সময়ে আমদানি বেড়ে গেলে রিজার্ভে টান পড়ে বাংলাদেশের। বর্ধিত আমদানি দায় মেটাতে গিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য লেনদেনে হিমশিম খায় বাংলাদেশ। তখন আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ নেয় বাংলাদেশ, যা কয়েক কিস্তিতে ছাড় হচ্ছে।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আর্থিক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে ব্যাংক খাতের সংস্কারে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অর্থপাচারের দীর্ঘ দিনের অভিযোগের তদন্ত জোরালো করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গভর্নরের দায়িত্ব এসে আহসান এইচ মনসুর আর্থিক সংস্কারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নানা উদ্যোগ নেন। বেসরকারি ৫ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক গঠন করেন। কমপক্ষে দেড় ডজন ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শন চালিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আইএমএফের চাওয়া অনুযায়ী বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের উপর ছেড়ে দেন।
অন্যদিকে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় করছাড় সুবিধা আরও কমিয়ে আনার চাপ ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর।
এসব নিয়ে আলোচনার পর আইএমএফও কিস্তি ছাড়ে সময় নেয়। সংস্থাটি ঘোষণা দেয়, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় করা হবে। সেই আলোকে ঢাকা সফর করলেন আইএমএফের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কৃষ্ণ শ্রীনিবাস।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আগের শর্তে পর্যায়ক্রমে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার একটি পরিকল্পনা ছিল। এখনতো তা আরো বেড়ে ৩৫ শতাংশে চলে গিয়েছে।

দুর্বল ব্যাংকের পাঁচটি একীভূত করলেও ডজন খানেক ব্যাংকের সমস্যা কাটেনি। বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেনে স্থিতিশীলতা ফেরানো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার চলমান রাখা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের মত বিষয়গুলোর সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছে ইরান যুদ্ধের চাপ।
এতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে গিয়ে রিজার্ভে চাপ বাড়তে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দেওয়ায় আগের সংস্কার পরিকল্পনার হালনাগাদ রোডম্যাপ প্রয়োজন।
কর্মকর্তারা বলছেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে সময় বাড়াতে হবে। ব্যাংকগুলোর জন্য পৃথক পৃথক পরিকল্পনা নিয়ে সার্বিকভাবে নতুন পরিকল্পনা লাগবে।
এছাড়া আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ার মধ্যে রিজার্ভ ধরে রাখতে নতুন করে বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ লাগবে।
সেক্ষেত্রে ঋণের অঙ্ক আরো বাড়িয়ে নেওয়ার আবেদন নিয়ে আলোচনা করা হবে এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফের কমকর্তা পর্যায়ের বৈঠকে।
অপরদিকে দুর্বল ব্যাংকের সুশাসন ফেরাতে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেটির ধারাবাহিকতা কীভাবে রক্ষা হবে সে বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনাও জানতে চাইবে সংস্থাটি। সেই প্রস্তুতিও নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।ৎ
এগুলোর বাইরে নির্বাচিত সরকারের সময়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পানায় নতুন মুদ্রানীতি কীভাবে সাজানো হবে সেই প্রশ্নও রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইএমএফের সামনে।
আর্থিক সংকট সামাল দিতে ২০২২ সাল থেকে কয়েক দফা আলোচনা শেষে পরের বছরের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ।
সবশেষ গত জুনে অর্থ ছাড়ের সময়ে ঋণের আকার বাড়িয়ে করা হয় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। সে বছর ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার পায় বাংলাদেশ। একই বছরের ডিসেম্বরে পাওয়া যায় দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ২০ লাখ ডলার।
তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি ডলার আসে ২০২৪ সালের জুনে। শর্ত বাস্তবায়নে দেরি হওয়া চতুর্থ কিস্তি আটকে রেখে সময় বাড়িয়ে দিয়ে ২০২৫ বছরের জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি একসঙ্গে মিলিয়ে ১৩৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার হাতে পায় বাংলাদেশ।
পাঁচ কিস্তির ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। ষষ্ঠ কিস্তি ও অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের সময় ছিল গত বছরের ডিসেম্বরে।
