
সংকট শুরু হওয়ার ঠিক আগে জ্বালানি সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চের মধ্যে তিনটি কোম্পানি মিলে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার টন ডিজেল বরাদ্দ দিয়েছে—যা স্বাভাবিক ১২-১৩ হাজার টন চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ।
এপ্রিলের তীব্র গরমে সারা দেশে ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে—যা মাঠ পর্যায়ে জ্বালানি সংকটের ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়ে তুলছে। তবে পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে জ্বালানি আমদানি বেড়েছে ১৩.৬৬ শতাংশ এবং আমদানি ব্যয় বেড়েছে আরও বেশি, প্রায় ২৮.৮২ শতাংশ।
আমদানির পরিমাণ বাড়লেও মার্চের শুরু থেকেই দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এই সংকট প্রকট হয়েছে। এতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৫৭.৪ লাখ টন জ্বালানি আমদানি করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ৫০.৫ লাখ টন। আমদানিকৃত জ্বালানির তালিকায় রয়েছে ডিজেল, ক্রুড তেল, ফার্নেস তেল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েল।
আমদানিকৃত জ্বালানির মূল্য ছিল ৪৩ হাজার ৭৩৩.৫৮ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ৯ হাজার ৬৮৬.৬৩ কোটি টাকা শুল্ক -কর যোগ হয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৪২০.২১ কোটি টাকা—যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪১ হাজার ৬৬৭.৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের তুলনায় মাত্র ৬ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৯ টন বেশি জ্বালানি আনতে গিয়ে সরকারকে অতিরিক্ত ১১ হাজার ৭৫২.৫২ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে।
কেন এই বৃদ্ধি
এই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ২৬.৮৭ লাখ টন ডিজেল, ১৬.০২ লাখ টন ক্রুড তেল ও ১১.২৬ লাখ টন ফার্নেস তেল আমদানি করেছে। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েলের আমদানি বাড়লেও ফার্নেস তেলের আমদানি কমেছে।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কেবল ডিজেল আমদানিই বেড়েছে প্রায় ৬ লাখ টন। ক্রুড তেলের আমদানিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। অন্যদিকে ফার্নেস তেল আমদানি কমেছে ৩ লাখ টনের বেশি।
প্রতি টন জ্বালানির আমদানি খরচও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতি টন ডিজেলের গড় আমদানি ব্যয় ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৭৯৬ টাকা—যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৮৮ হাজার ৪৪২ টাকা। অর্থাৎ প্রতি টনে খরচ বেড়েছে ১৪ হাজার টাকারও বেশি। অন্যান্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও প্রতি টনে ব্যয় একইভাবে বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানির পরিমাণের তুলনায় ব্যয়ের এই অসামঞ্জস্য বিশ্ববাজারে জ্বালানির চড়া দাম ও ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে। তবে ব্যয়ের এই বিশাল উল্লম্ফন অনেককেই বিস্মিত করেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, জ্বালানি ব্যবহার এবং আমদানি ব্যয়—দুই ক্ষেত্রেই এই আকস্মিক বৃদ্ধি অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। তিনি টিবিএসকে বলেন, ‘মাত্র ৯ মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৬ লাখ টন ডিজেলের ব্যবহার ব্যাখ্যা করা কঠিন। সরকারের উচিত বিষয়টি খতিয়ে দেখা।’
তিনি আরও বলেন, এই সময়ের বেশিরভাগ সময়জুড়ে জ্বালানির দাম মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। ‘মার্চ মাস বাদে দামের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই ২৮ শতাংশ খরচ বাড়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়।’
ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. খোরশেদ আলমও ব্যয়ের এই অসামঞ্জস্যের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমদানি যদি ১৩ শতাংশের মতো বাড়ে, তাহলে ব্যয় ২৮ শতাংশ বাড়া কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়।’
একটি স্বাধীন নিরীক্ষার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা চিহ্নিত করা উচিত। আর যদি অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যয় বেড়ে থাকে, তবে খরচ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।’
খোরশেদ আলম আরও বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তজনায় দাম বাড়ার আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬-এর জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্ববাজারে ক্রুড তেলের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল—প্রতি ব্যারেলে ৮১-৮২ ডলারের আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল। ‘তাই ব্যয় এতটা বাড়ার ভিত্তি স্পষ্ট নয়।’
আমদানি বাড়লেও সরবরাহে টান
আমদানি বাড়া সত্ত্বেও এ বছরের মার্চ মাসের শুরু থেকে সারা দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে শুরু করে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়; কিছু পাম্প সাময়িকভাবে জ্বালানি শূন্য হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি যতটা না আমদানিতে, তার চেয়ে বেশি বিতরণে।
বিপিসি যদিও জ্বালানি সংগ্রহের কাজ করে, তবে এর বিতরণ ব্যবস্থা তিনটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হয়—পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। এই কোম্পানিগুলোই দেশজুড়ে ডিলারদের জ্বালানি সরবরাহ করে।
পরিসংখ্যান বলছে, সংকট শুরু হওয়ার ঠিক আগে জ্বালানি সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চের মধ্যে এই তিনটি কোম্পানি মিলে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার টন ডিজেল বরাদ্দ দিয়েছে—যা স্বাভাবিক ১২-১৩ হাজার টন চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ।
মাত্র সাত দিনে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টন জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে, যা প্রত্যাশিত ৮৪ হাজার টনের চেয়ে অনেক বেশি। এর অর্থ হলো, ১৬ দিনের স্বাভাবিক ব্যবহারের সমান জ্বালানি মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে ছাড়া হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেন, প্রতিটি কোম্পানি সাধারণত দিনে ৩ হাজার ৬৬৫ থেকে ৪ হাজার টন জ্বালানি বিক্রি করে। কিন্তু ওই সময়ে প্রতিটি কোম্পানির দৈনিক বিক্রির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৮ হাজার টন।
নাম না প্রকাশের শর্তে যমুনা অয়েলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই ঘটনাকে স্পষ্ট অব্যবস্থাপনা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত অল্প সময়ে এত বিশাল পরিমাণ জ্বালানি কোথায় গেল?
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সাধারণত কোম্পানিগুলো প্রতিদিন কতটুকু জ্বালানি বিক্রি করতে পারবে তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। তবে দিনের পর দিন যখন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিক্রি হচ্ছিল, তখন কর্তৃপক্ষের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।’
বিষয়টি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নজরে আসার পর দৈনিক বরাদ্দের পরিমাণ কমিয়ে পুনরায় প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টনে নামিয়ে আনা হয়।
মজুতের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, অতিরিক্ত সরবরাহের একটি বড় অংশই মজুত করা হতে পারে।
ম তামিম বলেন, ‘এক সপ্তাহে যদি ১ লাখ ৭৫ হাজার টন জ্বালানি বিক্রি হয়, তবে ডিলাররা বড় বিপুল পরিমাণ মজুত করে থাকতে পারেন।’ তিনি আরও বলেন, এই জ্বালানি কোথাও পাচার হয়েছে কি না, কর্তৃপক্ষের সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
খোরশেদ আলমও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, দাম বাড়ার আশায় পাম্প মালিক ও পরিবেশকরা প্রায়ই জ্বালানি মজুত করেন। ‘সরকারের সাম্প্রতিক অভিযানে ইতিমধ্যেই মাত্রাতিরিক্ত মজুতদারির বেশ কিছু ঘটনা ধরা পড়েছে।’
তিনি বলেন, এই ধরনের প্রবণতা জনমনে আতঙ্ক ছড়ায় এবং কৃত্রিম সংকটের ধারণা তৈরি করে। তার মতে, কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করলেও এক্ষেত্রে কিছু ত্রুটি থাকতে পারে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বিপিসির পরিচালক (অপারেশনস) এ কে মোহাম্মদ শামসুল আহসান ও পরিচালক (মার্কেটিং) মো. সাবের আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সামগ্রিক চিত্র
বাংলাদেশে জ্বালানির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭২ লাখ টন, যার ৯২ শতাংশের বেশি বিপিসি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। এর মধ্যে ক্রুত তেলের একটি অংশ—প্রায় ১৫ লাখ টন—ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে স্থানীয়ভাবে পরিশোধিত হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, আমদানিতে কোনো ঘাটতি নেই। বরং এটি তদারকি, বিতরণ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কঠোর তদারকি এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় ছাড়া কাগজে-কলমে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও এ ধরনের বিঘ্ন বারবার ঘটতে পারে।
