পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জাহাজ কোম্পানিগুলোকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে ভরসা দেওয়া।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে একটি বড় জোট গঠনের পরিকল্পনা করছে ইউরোপের দেশগুলো। সেখানে মাইন অপসারণকারী ও সামরিক জাহাজ পাঠানো হবে। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই কেবল এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। আর এই জোটে হয়তো একটি বিশেষ দেশ থাকছে না—যুক্তরাষ্ট্র। 

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ গত মঙ্গলবার জানিয়েছেন, এটি হবে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষামূলক মিশন। এখানে কোনো ‘যুদ্ধরত’ পক্ষ—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান থাকবে না। পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ইউরোপীয় কূটনীতিকেরা বলছেন, ইউরোপের কোনো জাহাজ মার্কিন নির্দেশের অধীনে চলাচল করবে না।  

এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জাহাজ কোম্পানিগুলোকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে ভরসা দেওয়া। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ শেষ হতে এখনো বেশ সময় লাগতে পারে।  

এই পরিকল্পনায় জার্মানিকেও যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে। দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেশের বাইরে কোনো সামরিক অভিযানে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে জার্মানি আইনি ও রাজনৈতিক বাধার সম্মুখীন হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবারের মধ্যেই জার্মানি হয়তো নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করবে। 

জার্মানি যুক্ত হলে মিশনটি আরও শক্তিশালী হবে। কারণ, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের চেয়ে জার্মানির আর্থিক সামর্থ্য বেশি। তাছাড়া, এই নির্দিষ্ট মিশনের জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জামও তাদের রয়েছে।

যুদ্ধ শেষে কীভাবে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী শুক্রবার একটি অনলাইন বৈঠকের আয়োজন করবেন মাখোঁ ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। এতে কয়েক ডজন দেশ অংশ নেবে।

প্যারিসের এই আয়োজনে স্টারমার সশরীরে উপস্থিত থাকবেন। অন্য দেশগুলো ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এতে অংশ নেবে না বলে জানিয়েছেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা। চীন ও ভারতকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তবে তারা অংশ নেবে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। 

গত মঙ্গলবার ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো বলেন, ‘আমরা যে মিশনের কথা বলছি, তা কেবল যুদ্ধ থামলে এবং শান্তি ফিরলেই শুরু করা হবে।’ তিনি জানান, এই আন্তর্জাতিক জোট প্রণালির তীরবর্তী দেশগুলোর (যেমন ইরান ও ওমান) সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। এর মানে হলো, ইরানের সম্মতি ছাড়া কোনো মিশন এগোবে না। 

যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে মতবিরোধ 

তবে জোটের ভেতরে ইউরোপের নিজেদের মধ্যেই কিছু মতবিরোধ মেটানো বাকি। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ফরাসি কূটনীতিকরা মনে করেন, এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র থাকলে তা তেহরান ভালোভাবে নেবে না। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রেগে যেতে পারেন। এতে করে উল্টো অভিযানের পরিসর কমে যেতে পারে।  

যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেওয়া নিয়ে এই বিতর্ক মূলত ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের (ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যকার সম্পর্ক) অবনতিকেই সামনে আনছে। গত এক বছরে ট্রাম্প ইউরোপের রপ্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক বসিয়েছেন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ করেছেন।

এমনকি ন্যাটো মিত্র ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে সামরিক শক্তি ব্যবহারেরও হুমকি দিয়েছেন তিনি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে এই টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। ইউরোপের বেশির ভাগ নেতাই এই যুদ্ধকে বেআইনি ও অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করেন। 

জোর করে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে উপসাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউরোপীয় মিত্রদের চাপ দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। কিন্তু ইউরোপীয়রা তাতে রাজি হননি। 

মাখোঁ বলেছেন, জোর করে প্রণালি খোলা রীতিমত ‘অবাস্তব’। এতে অনেক সময় লাগবে এবং জাহাজগুলো উপকূলীয় হামলা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির মুখে পড়বে।

অন্যান্য নেতারাও বলেছেন, এমন পদক্ষেপ নিলে ইউরোপীয় ভোটারদের কাছে চরম অজনপ্রিয় একটি যুদ্ধে জড়াতে হবে তাদের।

এদিকে, ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করার মার্কিন প্রচেষ্টায় ইউরোপকে সাহায্য করতে বলেছেন ট্রাম্প। এর উদ্দেশ্য হলো, ইরানের অর্থনীতিতে ধস নামিয়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বাধ্য করা। উল্লেখ্য, তেল এবং সারসহ বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ মূল্যবান পণ্য এই পথেই যাতায়াত করে। 

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্টারমারসহ অন্য নেতারা এই প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছেন। তারা বলছেন, ইউরোপের মূল লক্ষ্য যান চলাচল আরও সীমিত করা নয়, বরং তা স্বাভাবিক করা।

সাহায্য না করায় ইউরোপের বেশ সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের থাকার বিষয়টি তিনি নতুন করে ভাবছেন। গত সপ্তাহে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে সাক্ষাতে ট্রাম্প বলেন, তিনি চাচ্ছিলেন ইউরোপ আরও বেশি এগিয়ে আসুক। 

পরিকল্পনার তিন লক্ষ্য 

ইউরোপের এই পরিকল্পনার বড় তিনটি লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, লজিস্টিক সাপোর্ট বা প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করা, যাতে প্রণালিতে আটকে থাকা শত শত জাহাজ নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, বড় পরিসরে মাইন অপসারণ অভিযান চালানো, যাতে আরও বেশি জাহাজ প্রণালিটির বড় একটি অংশ ব্যবহার করতে পারে। যুদ্ধের শুরুতে ইরান এই জলপথের কিছু অংশে মাইন পুঁতেছিল। জাহাজ চলাচল শুরু করতে এগুলো সরানো খুবই জরুরি। 

বিশ্লেষকদের মতে, মাইন অপসারণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইউরোপের সামরিক সক্ষমতা অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্র তাদের বেশির ভাগ মাইন অপসারণকারী নৌবহর বাতিল করেছে। অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলোর হাতে এমন ১৫০টির বেশি জাহাজ রয়েছে। তবে এটি বেশ সময়সাপেক্ষ কাজ।

পরিকল্পনার শেষ লক্ষ্য হলো, ফ্রিগেট ও ডেস্ট্রয়ার (বিশেষ ধরনের যুদ্ধজাহাজ) দিয়ে নিয়মিত সামরিক নজরদারির ব্যবস্থা করা। এতে জাহাজ কোম্পানিগুলো প্রণালি ব্যবহারে নিরাপদ বোধ করবে। তবে এর জন্য ঠিক কতগুলো যুদ্ধজাহাজ লাগবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।  

বিশ্লেষকেরা বলছেন, একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পরও জলপথটি সচল করতে পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপ বিষয়ক প্রধান মুজতবা রহমান বলেন, ‘জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দিতে কোনো না কোনো এক পর্যায়ে এসকর্ট সিস্টেম বা পাহারার ব্যবস্থা লাগবেই। বিমা কোম্পানি ও জাহাজ মালিকরা এই সুরক্ষা চাইবেন।’ 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নৌবাহিনীর ‘অপারেশন অ্যাসপিডস’-এর আদলে এই যৌথ মিশনটি পরিচালিত হবে। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দিতে এবং হুথিদের হামলা থেকে বাঁচাতে ২০২৪ সালে ইইউর কয়েকটি দেশ মিলে ওই মিশন শুরু করেছিল।  

ইইউ জানিয়েছিল, ওই মিশনটি ছিল পুরোপুরি আত্মরক্ষামূলক। হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি ও গ্রিস পর্যায়ক্রমে ফ্রিগেট ও হেলিকপ্টার দিয়ে সহায়তা করেছিল। মিত্র দেশগুলো একসঙ্গে অন্তত তিনটি জাহাজ দিয়ে এসকর্ট ও নজরদারির কাজ করত। 

এটি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়েছিল। মার্কিন মিশনটি ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চলেছিল এবং পরিসরে অনেক বড় ছিল। সেখানে বিমানবাহী রণতরী ও ডেস্ট্রয়ার ব্যবহার করা হয়েছিল।

জার্মানির ভূমিকা ও আইনি বাধা 

তবে জার্মানির এমন মিশনে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হরমুজ মিশনে যোগ দিতে হলে জার্মান সরকারকে পার্লামেন্টের অনুমতি নিতে হবে, যার জন্য আবার শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট বা অনুমোদন প্রয়োজন। এটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ‘চ্যাপ্টার ফোর’ ম্যান্ডেট হতে পারে, যেখানে শুধু আত্মরক্ষাই নয়, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের অনুমতিও থাকে।   

জার্মানি মাইন অপসারণকারী জাহাজ দিয়ে সাহায্য করতে পারে। বাল্টিক সাগরের উপকূলে কিয়েল বন্দরে দেশটির ১২টির মতো মাইন খোঁজার ও অপসারণের জাহাজ রয়েছে।  

তবে জার্মান নৌবাহিনী বর্তমানে রাশিয়াকে দমাতে বাল্টিক সাগর ও উত্তর আটলান্টিকে মোতায়েন আছে। তাই ওই মিশনের ঝুঁকি না বাড়িয়ে কিছু সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো যাবে কি না, তা নিয়ে বার্লিনকে ভাবতে হবে। নজরদারির কাজেও বার্লিন সাহায্য করতে পারে। জিবুতিতে জার্মানির অন্তত একটি নজরদারি বিমান রয়েছে, যা লোহিত সাগরের মিশনেও অংশ নিয়েছিল।