ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কঠিন পরীক্ষায় তারেক রহমানভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কঠিন পরীক্ষায় তারেক রহমান

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দেড় বছরের মাথায় বাংলাদেশে একটি উৎসবমুখর সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।  ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মসনদে বসেছে বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানে নেতৃত্বে গঠিন হয়েছে নতুন সরকার।

নির্বাচনে জনগণ এমন একজন নেতাকে বেছে নিয়েছে যিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আমূল পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে নতুন ভারসাম্য তৈরির প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছেন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার পর, তারেক রহমান তার দলকে বিশাল বিজয় এনে দিয়েছেন। ২০২৪ সালে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মম দমন-পীড়নের পর—যেখানে প্রায় ১ হাজার ৪ শতাধিক মানুষ নিহত হন—জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ একটি শক্তিশালী বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে সেই অস্থিরতা চূড়ান্ত রূপ পায়।

বাংলাদেশের দীর্ঘতম মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসনে আছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার অনুপস্থিতে বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে এই রায় একটি নতুন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষের অনুরোধ সত্ত্বেও, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার—যাকে দীর্ঘদিন ধরে হাসিনার প্রধান বহিঃশক্তির সমর্থনকারী হিসেবে দেখা হতো—তাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করেছে। বিষয়টি দুই দেশের মধ্যকার আগে থেকেই নড়বড়ে সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।

দিল্লির ওপর অতিনির্ভরতা

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে অনেক বিশ্লেষক দীর্ঘদিনের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে জনঅভ্যুত্থানের বৈধতা হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে এটি শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি নয়াদিল্লির দীর্ঘমেয়াদি সমর্থনেরও স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান। ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখলেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পরিধি বিস্তৃত করেন। বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ছিল নিয়মিত। 

আঞ্চলিক কূটনীতিতে তার সরকার ভারতের দিকে ঝুঁকে ছিল, যা তার ১৫ বছরের শাসনামলে নয়াদিল্লিতে সাতবার দ্বিপাক্ষিক সফরকে প্রতিফলিত হয়। সমালোচকদের মতে, এই কূটনৈতিক ছন্দ এমন এক পররাষ্ট্রনীতির প্রতীক হয়ে ওঠে, যেখানে ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, অথচ বাংলাদেশের মূল দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলো রয়ে যায় অমীমাংসিত।

নিরাপত্তা সহযোগিতা ছিল সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্র। শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে সক্রিয় ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয় এবং নজিরবিহীন মাত্রায় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান চালু করে। এতে নয়াদিল্লির সমর্থন মিললেও দেশে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গণআলোচনা হয়নি। সংযোগ ব্যবস্থায়ও ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়। বাংলাদেশি ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হলেও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি অমীমাংসিত থেকে যায়। সীমান্তে হত্যাকাণ্ডও বন্ধ হয়নি। জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ ক্রমেই ভারতীয় বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বড় অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত অনুমোদিত হলেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে ঢাকা কখনো প্রকাশ্যে ভারতের বিরোধিতা করেনি। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল পরিমিত রাষ্ট্রনীতি, কিন্তু বিরোধীদের কাছে এটি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতা। ক্ষমতাচ্যুতির পর হাসিনার দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া সেই ধারণাকে আরও জোরালো করে।

প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন

বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর তারেক রহমান তিন দশকের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম পুরুষ প্রধানমন্ত্রী ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছেন। সম্প্রতি এক সমাবেশে তিনি বলেন: ‘নট দিল্লি, নট পিণ্ডি- বাংলাদেশ সবার আগে।’ 

তবে শেখ হাসিনার বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। ১৪ বছর পর করাচিতে সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়। ১৩ বছর পর পাকিস্তানি মন্ত্রীরা সফরে আসেন। সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা পুনরায় শুরু হয় এবং বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বাড়ে।

বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়ক (দিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস) সম্প্রতি বিবিসিকে বলেন, হাসিনার আমলে ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। দোলক ভারতের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকেছিল, এখন বিপরীত দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি আছে।