
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদী। ছবি: সংগৃহীত
রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা এর আগেও আলোচনা করেছিলাম, তার মধ্যেও আমেরিকা আমাদের ওপর হামলা করেছে। আমরা এবারও নিশ্চিত ছিলাম আমেরিকা আসলে আমাদের জন্য কোনো শান্তি বা শান্তি চুক্তির জন্য আসেনি। তারা মূলত বিশ্বের কাছে দেখাতে চেয়েছে যে তারা শান্তি চায় আর ইরান যুদ্ধ চায়।’
আটকে পড়া বাংলাদেশি জাহাজ দ্রুতই হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদী।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধাবস্থার জন্য অনেক জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে অপেক্ষায় আছে। বাংলাদেশের কিছু জাহাজও হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়েছে। আমরা বাংলাদেশকে সহযোগিতা করব। বাংলাদেশের জাহাজ ছাড়ার ব্যবস্থা করব ইনশাআল্লাহ। অতি দ্রুত জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে ইনশাআল্লাহ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলাপ করে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
রবিবার (১২ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপ্লবী ছাত্র পরিষদ আয়োজিত ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের শহীদ শিক্ষার্থীদের স্মরণ: মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধের বিচার ও জবাবদিহিতা দাবি’- শীর্ষক এক শোক সমাবেশ ও যুদ্ধাপরাধবিরোধী প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইরানি রাষ্ট্রদূত এসব কথা বলেন।
এ সময় তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো। বাংলাদেশকে আমরা ভাইয়ের দেশ হিসেবেই মনে করি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই।’
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্ততায় আলোচনার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদী বলেন, ‘যুদ্ধ বিরতির আলোচনার ব্যবস্থা করার জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। একইসঙ্গে ওমানসহ যারা আমাদের সহযোগিতা করেছে, তাদেরও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘ইরান ইসলামাবাদে বলে দিয়েছে- মর্যাদার ভিত্তিতে আলোচনা হলে আলোচনা করবে, নয়তো তারা কোনো আলোচনা করবে না। আমরা আমেরিকাকে এই বার্তা দিয়েছি, তারা যদি মর্যাদার ভিত্তিতে আলোচনা করে তাহলে আমরা আলোচনা করব, নয়তো করব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আর যতদিন পর্যন্ত আলোচনার জন্য যুদ্ধবিরতির সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, ততদিন আমরা হামলা করব না। তবে আমেরিকা যদি যুদ্ধবিরতি না মেনে হমলা চালায়, তাহলে ইরানও হামলা করতে বাধ্য হবে।’

ইসলামাবাদ আলোচনার ফলাফল প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা এর আগেও আলোচনা করেছিলাম, তার মধ্যেও আমেরিকা আমাদের ওপর হামলা করেছে। আমরা এবারও নিশ্চিত ছিলাম আমেরিকা আসলে আমাদের জন্য কোনো শান্তি বা শান্তি চুক্তির জন্য আসেনি। তারা মূলত বিশ্বের কাছে দেখাতে চেয়েছে যে তারা শান্তি চায় আর ইরান যুদ্ধ চায়।’
তিনি বলেন, ‘আসলে আমেরিকা কখনো শান্তি চায় না। তারা ইরানের ওপর এজন্য অন্যায়ভাবে হামলা করেছে। আমেরিকার ভাষ্য হলো বিশ্বের সব দেশ পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হতে পারবে, কিন্তু ইরান হতে পারবে না।’
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন সফল হয়নি জানিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমেরিকা মূলত ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হামলা চালিয়েছিল। তারা ভেবেছিল হামলা চালালে ইরানবিরোধীরা রাস্তায় নেমে আসবে এবং সরকার পতন হবে। কিন্তু দেখা গেলো ইরানের জনগণ রাস্তায় ঠিকই নেমেছে, কিন্তু তা সরকারের পক্ষে, আমেরিকার বিরুদ্ধে।’
তিনি বলেন, ‘আমেরিকার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে, তারা সফল হয়নি। আমেরিকা চেয়েছে হরমুজ প্রণালি নিজেদের মতো চালাবে, কিন্তু সেখানেও তারা ব্যর্থ হয়েছে।’
ইরানের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালনের জন্য বিপ্লবী ছাত্র পরিষদকে ধন্যবাদ জানান রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, ‘আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে। তারা হাসপাতালে হামলা চালিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হামলা চালিয়েছে, স্কুলে হামলা চালিয়েছে। তারা হাসপাতালে হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে এবং স্কুলে হামলা চালিয়ে নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করেছে। ইরান এসব হামলার বিরুদ্ধে মূলত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আসলে ইরান কখনোই যুদ্ধ চায় না। কারণ যুদ্ধের দ্বারা মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্ববাসী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে আমেরিকা ও ইসরায়েল চায় না যুদ্ধ বন্ধ হোক।’
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানান।
তিনি বলেন, ‘সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরায়েল আজ ইরানের শিশুদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলছে। ইরানের স্কুলে বোমা হামলা চালিয়ে শিশুদের হত্যা করা বিশ্ববিবেকের ওপর চপেটাঘাত। আমরা এই বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের দাবি করছি।’

বি: সৌজন্যে
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইরানের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ রেজা মীর মোহাম্মাদী, জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক সাইয়েদ কুতুব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক নেত্রী মরিয়ম জামিলা তামান্না।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের সহকারী সদস্য সচিব গালীব ইহসান, সদস্য সাইদুল ইসলাম, বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের সদস্য সচিব ফজলুর রহমান, সহকারী সদস্য সচিব ডা. নাবিল আহমদ ও জিহাদী ইহসান, মো. আরিফুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলায় শাখার আহবায়ক সানোয়ারা খাতুন প্রমুখ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ প্রতিবাদী কর্মসূচিতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় শহীদ ইরানি শহীদ শিশুদের প্রতীকী কফিন, রক্তাক্ত স্কুল ব্যাগ ও ছবি প্রদর্শনী এবং যুদ্ধবিরোধী স্বাক্ষর কর্মসূচির আয়োজন করে বিপ্লবী ছাত্র পরিষদ।
এ সময় স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইরানি শিশুদের রক্ষায় মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রসান বিরোধী লড়াইয়ে শামিল হতে রক্ত ভেজা হাতের ছাপ দেন।
সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় সংহতি জানাতে জড়ো হন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা। সমাবেশের মূল আকর্ষণ ছিল সারিবদ্ধভাবে রাখা ছোট ছোট প্রতীকী কফিন, যা ইসরায়েলি হামলায় নিহত নিরপরাধ ইরানি শিশুদের স্মরণে তৈরি করা হয়েছে। এই দৃশ্য উপস্থিত সবার মধ্যে শোকের ছায়া ফেলে।
সমাবেশে উপস্থিত একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো যুদ্ধই শিশুদের মৃত্যুর কারণ হওয়া উচিত নয়। রাজনৈতিক স্বার্থে শিশুদের জীবন কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
কর্মসূচিতে একটি ‘যুদ্ধবিরোধী স্বাক্ষর কর্মসূচি’ পালিত হয়। যেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থীরাসহ সর্বস্তরের মানুষ যুদ্ধ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে স্বাক্ষর করেন।
এই গণস্বাক্ষর সম্বলিত স্মারকলিপিটি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোতে পাঠানো হবে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। নিহত শিশুদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া কামনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।
