ইংল্যান্ডের একটি বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করছে মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি বি-৫২ স্ট্রাটোফোট্রেস বোমারু বিমান।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সংযত আচরণের একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রয়েছে। এটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, আমেরিকার ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’ শর্তসাপেক্ষ এবং সীমিত। নিজেদের অংশীদারদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ করবে না—এমনকি যারা তাদের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্যও সর্বোচ্চ দেবে না ওয়াশিংটন।

ইরান ও ইসরায়েলের সম্মিলিত অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী কোনো স্থিতিশীলতা আসবে কি না, তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো এবং একটি প্রাচীন সভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার যে সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটন নিয়েছে, তা কেবল এই অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়েও বেশ কিছু উপসংহারে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

প্রথমত, এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করেছে যে, যখন কোনো পরাশক্তির গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ সরাসরি ঝুঁকির মুখে থাকে না, তখন তাদের সক্ষমতারও একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এক বিপজ্জনক দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে যেকোনো সময় একটি বড় ধরনের সামরিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই যায়। আর এই বিপজ্জনক প্রবণতা কমার কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

ওয়াশিংটনের কাছে যখন স্পষ্ট হলো যে, প্রচলিত সামরিক শক্তির মাধ্যমে ওয়াশিংটন না পারছে ইরানের প্রতিরোধ ভাঙতে, না পারছে ‘হরমুজ প্রণালি’ উন্মুক্ত রাখতে তাদের বাধ্য করতে; তখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি বিকল্প ছিল: হয় পিছু হটা, নয়তো পারমাণবিক যুদ্ধের পথে হাঁটা। 

তবে মুখে যত হুমকিই দেওয়া হোক না কেন, পারমাণবিক হামলার বিষয়টি কখনোই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি। মার্কিন নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল যে, এই সংকটে স্বার্থের চেয়ে ঝুঁকির পাল্লা অনেক বেশি ভারী।

ফলস্বরূপ, এই সংঘাত কার্যত তেহরানের জন্য ইতিবাচক শর্তেই থেমে গেছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ও সামরিক ব্যর্থতা। তারা একদিকে যেমন তুলনামূলক দুর্বল একটি প্রতিপক্ষকে দমাতে পারেনি, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের ইরানের পাল্টা হামলা থেকেও সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

একই সময়ে, ওয়াশিংটনের কাছে এটি ছিল একটি দূরদেশের যুদ্ধ, যা মার্কিন ভূখণ্ড থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে সংঘটিত হয়েছে। কারিগরি দিক থেকে বিচার করলে, ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলেও মার্কিন জনজীবনে তার কোনো সরাসরি প্রভাব পড়ত না। কিন্তু ১৯৪৫ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য অনেক। তখন জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আসন্ন স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। তখন এটি কৌশলগত লক্ষ্যের সঙ্গে জড়িত ছিল, কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে তেমনটি নয়।

সহজ কথায়, ওয়াশিংটনের জন্য এই খেলায় লাভের চেয়ে ঝুঁকিই বেশি ছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সংযত আচরণের একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রয়েছে। এটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, আমেরিকার ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’ শর্তসাপেক্ষ এবং সীমিত। নিজেদের অংশীদারদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ করবে না—এমনকি যারা তাদের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্যও সর্বোচ্চ দেবে না ওয়াশিংটন।

এই বাস্তবতা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়। ইউরোপে, বিশেষ করে রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্তের দেশগুলো এতদিন আমেরিকার শর্তহীন সুরক্ষাকে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস এখন নড়বড়ে হয়ে গেছে। ফিনল্যান্ড বা বাল্টিক দেশগুলোর মতো রাষ্ট্রগুলো যারা ভেবেছিল যে কোনো পরিস্থিতিতেই যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত হস্তক্ষেপ করবে, তারা এখন নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।

এর পেছনে একটি রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের মানসিকতা এমন যে, তারা মর্যাদা বা ক্ষমতার চেয়ে বৈষয়িক স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেয়। ট্রাম্প ও তার বলয় আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার চেয়ে একজন ব্যবসায়ীর দৃষ্টিভঙ্গিতে বেশি দেখে। তাদের কথাবার্তা মাঝেমধ্যে আক্রমণাত্মক মনে হলেও, সংঘাতের খরচ যখন অতিমাত্রায় বেড়ে যায়, তখন তারা আপস করতে দ্বিধাবোধ করে না।

ইরানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করলে তা মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলত। ওয়াশিংটন এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত নয় এবং এতে তাদের কোনো আগ্রহও নেই। অন্যান্য পরাশক্তিগুলো এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বিশেষ করে চীন ইতোমধ্যে তাদের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে এবং রাশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তবধর্মী সহযোগিতা ও পারস্পরিক লাভের ওপর জোর দিচ্ছে।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই ধারায় দ্রুত পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। ট্রাম্পের পর যদি জেডি ভ্যান্স বা মার্কো রুবিওর মতো নেতারাও ক্ষমতায় আসেন, তবে মূল দর্শনে হয়তো পরিবর্তন আসবে না। এরাও এমন রাজনীতিবিদ যারা বিমূর্ত কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্যের জন্য জন্য দৃশ্যমান বাস্তব লাভ বিসর্জন দিতে আগ্রহী নন।

এই ধারা চলমান থাকবে যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে যে তাদের বৈশ্বিক আধিপত্য মারাত্মকভাবে কমে আসছে অথবা তারা নিজেদের অবস্থানকে চরম নড়বড়ে মনে করছে। হিসাব-নিকাশ তখন বদলে যেতে পারে, যখন ‘নিষ্ক্রিয় থাকার চেয়ে সংঘাতে জড়ানোই বেশি লাভজনক’ মনে হবে ওয়াশিংটনের কাছে। আর যখন সেই মুহূর্তটি আসবে, তার পরিণতি হবে ভয়াবহ এবং তা কেবল একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।