কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় আমদানি ব্যাহত হলে লোডশেডিং বাড়তে পারে এবং জ্বালানি খরচও বেড়ে যেতে পারে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। এতে দেশে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং প্রায় ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় আমদানি ব্যাহত হলে লোডশেডিং বাড়তে পারে এবং জ্বালানি খরচও বেড়ে যেতে পারে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ করছে। অথচ বিদ্যুৎ খাতে চাহিদা ২,৫২৪.৯ এমএমসিএফডি।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালী দিয়ে এলএনজি কার্গো আসা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ ২০০ থেকে ২৫০ এমএমসিএফডি কমতে পারে। এতে সরবরাহ নেমে প্রায় ৭০০ এমএমসিএফডিতে দাঁড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে ১,৪০০–১,৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে কর্মকর্তাদের ধারণা।

এর আগে জ্বালানি বিভাগ বিদ্যুৎ খাতে ১,০০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা করেছিল। তবে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ পেট্রোবাংলা সরবরাহ করেছে মাত্র ৮৬৯.৭ এমএমসিএফডি, যেখানে চাহিদা ছিল ২,৫২৪.৯ এমএমসিএফডি। খাতসংশ্লিষ্টরা এই চাহিদাকে ‘সাপ্রেসড ডিমান্ড’ বা সুপ্ত চাহিদা বলে উল্লেখ করেছেন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী মোকাবিলার পরিকল্পনা নেওয়া হবে।”

জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গতকাল টিবিএসকে জানান, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহকারীদের সঙ্গে। অধিকাংশ কার্গো হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে।

তিনি বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহকারী কাতারএনার্জি হরমুজ প্রণালী দিয়ে কার্গো পাঠায়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমাতে হবে।”

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর শনিবার রাতে সামুদ্রিক রেডিও বার্তায় জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে চলার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

যদিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার আল জাজিরাকে বলেছিলেন, তেহরানের এখনই এই কৌশলগত সমুদ্রপথ বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই।

তবে মঙ্গলবার ভোরে দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের সিনিয়র উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যারা এই পথে জাহাজ চালানোর চেষ্টা করবে, তাদের জাহাজ জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।’

শিপিং তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক অপারেটর, বড় তেল কোম্পানি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো সরে যাওয়ায় কার্যত বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের জন্য এই পথ অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে।

পেট্রোবাংলার আমদানি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে সাতটি এলএনজি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি হরমুজ প্রণালী হয়ে আসবে এবং একটি আসবে অ্যাঙ্গোলা থেকে।

কর্মকর্তারা জানান, তিনটি কার্গো ইতোমধ্যে প্রণালী পার হয়েছে। বাকিগুলোর বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

জ্বালানি সচিব বলেন, বর্তমানে দুটি কার্গো ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি বলেন, “কাতার থেকে এলএনজি আনতে আমরা সমস্যায় পড়ছি। যদি দুটি কার্গো না আসে, তাহলে মার্চে সরবরাহ লাইনে ২০০ থেকে ২৫০ এমএমসিএফডি ঘাটতি হবে।”

এলএনজি সরবরাহ গুরুতরভাবে ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিস্থিতি কী হবে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, “সব দিক বিবেচনায়, দীর্ঘ সময় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে আমাদের লোডশেডিং দিতে হতে পারে।”

ঘাটতি সামাল দিতে কয়লা ও তেল

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৪৫৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এসেছে ৪ হাজার ৬৩০ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৯৫ মেগাওয়াট এবং এইচএফও বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। বাকি অংশ এসেছে অন্যান্য উৎস থেকে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন শিগগিরই ৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাবে। পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে এক মাসের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত কয়লা মজুত রয়েছে।”

জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলাম জানান, এলএনজি ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ফার্নেস অয়েলের দাম কমিয়েছে। পাশাপাশি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

স্পট মার্কেট থেকে কেনা বাড়তে পারে

দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে—বিশেষ করে বছরে প্রায় ৪০টি কার্গো সরবরাহের চুক্তি থাকা কাতারএনার্জিকে ঘিরে—নীতিনির্ধারকেরা স্পট মার্কেট থেকে কেনা বাড়ানোর বিষয়টি ভাবছেন। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলেন, বিদ্যমান চুক্তির আওতায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনা ছাড়া উপায় থাকবে না। এতে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়বে।

আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে অতিরিক্ত ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে—এমন প্রশ্নে সাইফুল ইসলাম বলেন, “স্পট মার্কেট থেকে কেনা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল। প্রয়োজন হলে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।”

বাংলাদেশ এ বছর মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে ১০৩টি দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় এবং ১২টি স্পট মার্কেট থেকে কেনার কথা ছিল। তবে হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতির কারণে স্পট মার্কেট থেকে আমদানি বাড়াতে হতে পারে।

পেট্রোবাংলার মার্চ থেকে মে মাসের আমদানি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই তিন মাসে ২২টি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি হরমুজ প্রণালী হয়ে আসবে।

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বেড়েছে

সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়িয়েছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ভোর ৪টায় আদানি পাওয়ার থেকে ১,৪১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়েছে। রোববার রাত ১০টায় এ পরিমাণ ছিল ১,৪৫২ মেগাওয়াট।

ভেড়ামারা এইচভিডিসি প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই লাইনে আমদানি ৮৫০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াটের মধ্যে ছিল।

এছাড়া ত্রিপুরা থেকেও ১০০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে।