ছয় সপ্তাহের সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এর মধ্যে ইরানের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনায় ইসরায়েলের কোনো প্রতিনিধিকে মেনে নেওয়া হবে না। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

আলোচনার ঠিক আগমুহূর্তে নিজের এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘ইসলামাবাদে যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হয়, তাহলে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে, যা উভয় পক্ষের পাশাপাশি বিশ্বের জন্যও উপকারী হতে পারে। তবে আলোচনায় যদি ইসরায়েলপন্থী কেউ থাকেন, তাহলে কোনো চুক্তি সম্ভব হবে না।’

রেজা আরেফ বলেন, ‘সে ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ আগের চেয়েও বেশি তীব্র করা হবে, যার ফলে বিশ্বকে আরও বড় মূল্য দিতে হবে।’

এদিকে শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে ইসলামাবাদে পৌঁছেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল। এর একদিকে আছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। এই আলোচনার ফলাফল কী হবে, তা এখনো অস্পষ্ট।

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষই এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিজেদের মতো করে সাজাতে চাইছে। তবে এখনো সম্ভাব্য অগ্রগতির আশা আছে।

দুই পক্ষের আলোচনা অবশ্য এটাই প্রথম নয়। গত ফেব্রুয়ারিতেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একদফা আলোচনায় বসেছিল। আলোচনা চলার মধ্যেই ইরানে হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে নিহত হন দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এর পরেই যুদ্ধ নতুন মোড় নেয়। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায় এবং বন্ধ করে দেয় বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী।

এরই মধ্যে শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে ইসলামাবাদ পৌঁছেছে ইরানের প্রতিনিধিদল। পাকিস্তানে অবতরণের পর দলটির প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে বলেছেন, ‘আমাদের সদিচ্ছা আছে কিন্তু আমাদের কোনো বিশ্বাস নেই। আমেরিকানদের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা সব সময়ই ব্যর্থতা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।’

মার্কিন প্রতিনিধিদলের প্রধান জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যও অনেকটা একই রকম। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই আলোচনায় বসছে। তবে একই সঙ্গে তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ছেলেখেলা না করে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দুই পক্ষের এই আলোচনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, দুই পক্ষই যেন সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনায় বসে।

শুক্রবার জাতিসংঘের এক সংবাদ সম্মেলনে মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, ‘গুতেরেস উভয় পক্ষকে কূটনৈতিক এই সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে উত্তেজনা প্রশমন এবং পুনরায় শত্রুতা শুরু হওয়া রোধ করার লক্ষ্যে একটি স্থায়ী ও ব্যাপক চুক্তির দিকে সদিচ্ছার সাথে অগ্রসর হওয়া যায়।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর ও শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতা করতে পেরে উচ্ছসিত পাকিস্তান। দেশটির রাস্তায় রাস্তায় ‘ইসলামাবাদ টকস’ লেখা ডিজিটাল বিলবোর্ড শোভা পাচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পতাকার মাঝে পাকিস্তানের প্রতীক রাখা হয়েছে। শান্তি আলোচনায় নিজেদের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে স্মরণীয় করে রাখতে দুই দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে পাকিস্তান।

সারা বিশ্বই এখন চাইছে, এই সংঘাত শেষ হোক এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হোক। অবশ্য পাকিস্তানের জন্য এই আলোচনার গুরুত্ব অন্য রকম।

সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ আব্দুল বাসিত বলেন, ‘যদি এই আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে পাকিস্তান এক ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। কারণ, এতে দেশটি প্রতিবেশী ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।’

আব্দুল বাসিত আরও বলেন, ‘তবে এটি পাকিস্তানের জন্য একটি বিজয়। কারণ, বিশ্বের অন্য কোনো দেশ এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে পারেনি এবং আমরা একটি সম্ভাব্য মহাবিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিলাম। পাকিস্তানের কারণে সেটি এড়ানো গেছে।